গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম ডিভিশন-০৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী এস. এম. ময়নুল হকের বিরুদ্ধে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR) লঙ্ঘন, টেন্ডার কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য ও বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের প্রতিকার এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এর আগে গত ২১ মে সংশ্লিষ্ট টেন্ডার বাতিল ও আইনি ব্যবস্থার হুশিয়ারি দিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি আইনি নোটিশ ও অভিযোগ পাঠায় ভুক্তভোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’। এরপর আজ (৩১ মে) ঢাকা ই/এম বিভাগ-৩ এর প্রকৌশলী ময়নুল হকের বিরুদ্ধে দুদক কার্যালয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন মো: সাদিক মাহমুদ নামে এক গণমাধ্যম কর্মী।
সিভিল কাজ ছাড়াই ই/এম টেন্ডার: পিপিআর-এর চরম লঙ্ঘন
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গণপূর্ত ই/এম ডিভিশন-০৩ সম্প্রতি দুটি বড় ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল (E/M) কাজের টেন্ডার আহ্বান করে (যার টেন্ডার আইডি যথাক্রমে: ১২৭৩৮৯৮ এবং ১২৭৩৮৯৯)। পিপিআর-এর মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো প্রকল্পের সিভিল বা অবকাঠামোগত কাজের একটি ন্যূনতম অগ্রগতি নিশ্চিত হওয়ার পর ই/এম কাজের দরপত্র আহ্বান করার নিয়ম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রোকিউরিং এনটিটি কোনো ধরনের বাস্তব প্রস্তুতি বা সিভিল কাজ ছাড়াই তড়িঘড়ি করে এই টেন্ডার দুটি আহ্বান করেছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সিভিল কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগে এই ধরনের টেন্ডার আহ্বান করায় কাজ শুরু হতে ৩ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ বিলম্ব হতে পারে। এর ফলে ঠিকাদারদের ওপর অস্বাভাবিক বাণিজ্যিক ঝুঁকি তৈরি হবে, যার মধ্যে রয়েছে বাজারদরের তীব্র ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা এবং যন্ত্রপাতির প্রযুক্তিগত অপ্রচলন (Obsolescence)। সিভিল কাজ প্রস্তুত না থাকায় সাইট হস্তান্তরে বিলম্ব হবে, যা পরবর্তীতে সময় বৃদ্ধি (EOT), মূল্য সমন্বয় ও ক্ষতিপূরণ দাবির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের বড় অঙ্কের অপচয় ঘটাবে।
নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে শর্তের মারপ্যাঁচ
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, পিপিআর-এর উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দরপত্রের শর্তাবলীতে এমন কিছু অযৌক্তিক বাধ্যবাধকতা ও ‘অভিজ্ঞতা একত্রকরণ’-এর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ ও যোগ্য ঠিকাদারেরা অংশ নিতে না পারেন। একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট বা পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দরপত্রের তথ্য ফাঁস এবং প্রতিযোগিতা সীমিত করার এই কৃত্রিম কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেলেও ‘নিম্নমানের লিফট’ কেলেঙ্কারি
নির্বাহী প্রকৌশলী এস. এম. ময়নুল হকের (পরিচিতি নং: ১১০৮৩) বিরুদ্ধে অনিয়মের খতিয়ান এটাই প্রথম নয়। দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, এর আগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফট স্থাপন প্রকল্পেও তার বিরুদ্ধে মারাত্মক জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। সেখানে উচ্চমানের আন্তর্জাতিক লিফটের বরাদ্দ থাকলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অত্যন্ত নিম্নমানের ‘চায়না লিফট’ স্থাপন করা হয় এবং কোনো কাজ না করেই অতিরিক্ত ভুয়া বিল উত্তোলন করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা ই/এম বিভাগ-৩ এর অধীনে অন্তত ৩০টিরও বেশি টেন্ডারে এই ধরনের জালিয়াতি ও কমিশন বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (BPPA) এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবরও লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মেসার্স MS ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড-এর পক্ষ থেকে অবিলম্বে টেন্ডার আইডি ১২৭৩৮৯৮ ও ১২৭৩৮৯৯ স্থগিত বা বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, দ্রুত এই বিষয়ে তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশনসহ আইনগত প্রতিকার প্রার্থনা করবে।
এই অভিযোগের অনুলিপি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে অবগতি ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়েছে।






